২৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৯:৩৬ এএম

বছরজুড়ে ডেঙ্গু প্রকোপ: মৃত্যু ও শনাক্তে রেকর্ড 

বছরজুড়ে ডেঙ্গু প্রকোপ: মৃত্যু ও শনাক্তে রেকর্ড 
অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, ‘ডব্লিউএইচওর স্বীকৃত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর যে হার আছে, তার চেয়ে দেশে মৃত্যু অনেক কম হয়েছে।’

আলী হোসাইন: গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলছে। তবে বিদায়ী বছরে অতীতের অন্য সময়ের চেয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তনের কারণে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি ছিল। তারা আরও বলেন, জনগণ সচেতন হলে এবং মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশন কার্যকর ভূমিকা পালন করলে পরিস্থিতি এতো খারাপ হতো না। তবে সিটি কর্পোরেশন দাবি, তারা মশা নিধন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

মৃত্যু ও আক্রান্ত বাড়ার কারণ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা লিমা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘দিন যত যাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ তত বাড়তে থাকবে। ২০২০ এবং ২১ সালে কোভিডের কারণে এটি চাপা পড়েছিল। ডেঙ্গুর চারটি ধরন আছে:- ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। ২০২১ সালে যদি কেউ ডেন-১ ধরনে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, ২০২২ যদি ডেন-২ এ আক্রান্ত হন, তাহলে তাঁর অবস্থা মারাত্মক হবে। দ্বিতীয়বার অন্য ধরনে আক্রান্ত হওয়ায় অবস্থা খুব খারাপ হয়। ফলে এটি বাড়তে থাকবে। এ বছর ডেন-৪ পাওয়া গেছে। ২০১৯ পর্যন্ত ডেন-৪ ছিল না। ডেন-৪ প্রকোপ বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সেটি তেমন গুরুতর হয় না। কিন্তু দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বারের মতো আক্রান্ত হলে অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। যারা মারা যাচ্ছেন, তারা এর আগেও নিশ্চিত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিলেন। অনেকে প্রথমে যখন জ্বর আসে, তখন চিকিৎসকের কাছে যান না। অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেলে চিকিৎসকের কাছে যান। এ ধরনের রোগী বেশি সমস্যায় পড়েন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘যে কোনো জ্বরে খাবার রুচি কমে যায়। পানি খেতেও ভাল লাগে না। ফলে পানি শূন্যতা দেখা যায়, হেমোরেজ হয়। এ সময় স্যালাইন বা পানি না খেলে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। বিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে আসার কারণে রোগী মারা যায়। দ্রুত চিকিৎসা নিলে হয়তো আর কম মারা যেতো।’

ডা. নুসরাত বলেন, ‘কেউ যদি প্রথমবার ডেন-১ ধরনে আক্রান্ত হন, তাহলে জ্বরের জন্য যেসব ওষুধ সেবন করা প্রয়োজন-তা করলেই হয়ে যায়। তবে কেউ যদি ডেন-২ ধরনে আক্রান্ত হন, তাহলে জীবন হুমকিতে দিকে চলে যায়। দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে জ্বর বেশি দিন থাকে না। দুই-তিন দিন থাকে।’

‘আমরা যদি মশা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, সচেতন না হই, সিটি কর্পোরেশন থেকে মশা নিধন কর্মসূচি না নেওয়া হয়, তাহলে দিন দিন বাড়তে থাকবে,’যোগ করেন তিনি।

এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্ত কেনো বেশি-এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডেঙ্গু বাংলাদেশে বেশ কিছু বছর ধরেই আছে। এটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রাইমারি কোনো বিষয় নয়। ২০১৮ সালের পর ডেঙ্গুর ডেন-১ ধরনে মানুষের আক্রান্ত হতে দেখা যায়নি। ২০২১ সালে অনেকে ডেন-৩ এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ বছর ডেন-৪ ধরনের প্রকোপ বেশি। আবার ডেন-৩ ও ডেন-১ ধরনেও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ দেশে এখন ডেঙ্গুর চারটি ধরন সক্রিয়। এটি ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ার একটি কারণ হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘পাবলিক হেলথ অনেকটা নির্ভর করে পরিবেশের উপর। স্থানীর সরকার এবং সিটিকর্পোরেশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ডেঙ্গুর আবাসস্থল এবং লার্ভার উৎস বন্ধ করতে না পারলে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।’

ডা. আহমেদুল কবীর আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত এবার ডেঙ্গুর চারটি ভ্যারিয়েন্টই সক্রিয় ছিল। তবুও ডব্লিউএইচওর স্বীকৃত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর যে হার আছে, তার চেয়ে দেশে মৃত্যু অনেক কম হয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে আগামী বছরগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়বে।’

চলতি বছর ডেঙ্গুতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর চিত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে ডিসেম্বর মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬২ হাজার ১২৭ জন। এ সময়ের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৭৮ জনের। এই বছর ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন নভেম্বর মাসে, ১০৬ জন। এই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ১৯ হাজার ৩৩৪ জন। অক্টোবর মাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২১ হাজার ৯৩২ জন। মৃত্যু হয়েছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ৯২ জনের। এছাড়া, জানুয়ারিতে আক্রান্ত ছিলেন ১২৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২০, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৩, মে মাসে ১৬৩ জন। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা যায়নি। জুন মাস থেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু শুরু হয়। এই মাসে আক্রান্ত হন ৭৩৭ জন, মারা যান একজন। জুলাইয়ে আক্রান্ত ১৫৭১ এবং মৃত্যু নয়জন; আগস্টে তিন হাজার ৫২১, মৃত্যু ১১ জন; সেপ্টেম্বর নয় হাজার ৯১১ জন, মৃত্যু ৩৪ জন; অক্টোবরে ২১ হাজার ৯৩২ জন, মৃত্যু ৮৬ জন এবং নভেম্বরে ১৯ হাজার ৩৩৪ জন এবং মৃত্যু ১১৩ জন। ডিসেম্বর মাসে এখনও পর্যন্ত আক্রান্ত চার হাজার ১৮৯ জন, মৃত্যু ২৪ জন।

বছরজুড়ে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকার চেয়ে ব্যক্তিগত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে ডা. নুসরাত সুলতানা বলেন, ‘গত দুই তিন বছর মানুষ অনলাইনে প্রচুর খাবার অর্ডার করেছেন। সে প্যাকেটগুলো যেখানে সেখানে ফেলা হয়েছে। এসব প্যাকেটে পানি জমে ডেঙ্গু মশা ডিম পাড়ার সুযোগ পেয়েছে। এখন গৃহসজ্জার একটি মাধ্যম হলো গাছ লাগানো। বাসায় অনেকে পানির মধ্যে গাছ রাখেন। তিন দিন পরপর পানি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে তো ঘরে ঢুকে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। এটি থেকেও ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। তবে সিটি কর্পোরেশন যদি ময়লা অপসারণে যথাযথ ব্যবস্থার করতো, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভালো থাকতো।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি.জে. মো. জোবায়দুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সারা বছর ফগিং মেশিন চলমান ছিল। এ ছাড়া ড্রোনের মাধ্যমে ছাদ বাগান দেখে ব্যবস্থা নিয়েছি। জনসচেতনতার জন্য রোড শো করেছি। বিভিন্ন অভিযোগ শুনে ব্যবস্থা নিয়েছি। যেসব রোগী হাসপাতালে গিয়েছেন, তাদের ঠিকানা সংগ্রহ করে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করেছি। সচেতনতার জন্য লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করেছি।

তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় সব দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল; অন্য দেশ থেকে আমাদের দেশ আলাদা নয়। তারপরও বিভিন্ন অভিযানের কারণে পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।’

গত কয়েক বছরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নানা প্রকল্প, উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। সে অনুযায়ী, এ বছর দুই সিটি করপোরেশন মশক নিধন কাজে কিছুটা গুরুত্ব দিয়েছে। বাড়িয়েছে এ খাতের বরাদ্দও।

এর পরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ছিল না বলে জানিয়েছেন নগরবাসী। তারা বলছেন, সিটি করপোরেশনের উচিত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

প্রসঙ্গত, প্রতি বছর বর্ষাকালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু জ্বরে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আক্রান্ত হয়েছিল এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। আর ২০২১ সালে এ রোগে মারা গেছেন ১০৫ জন এবং আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ডেঙ্গু
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক